আপনার বাজেটে কোনটি সেরা অ্যান্ড্রয়েড: মটো জি বনাম নেক্সাস ৪

 aa

গুগলের নেক্সাস প্রোগ্রামের সফলতা ও জনপ্রিয়তার অন্যতম মূল কারণ এর দাম। তুলনামূলক কম দামে নেক্সাস প্রোগ্রামের মাধ্যমে ফোন ও ট্যাবলেট বাজারজাত করতে শুরু করে গুগল। ফলে নতুন এক মূল্যমানের বাজারের সূচনা হয়। বিশেষ করে ফোনের জগতে কমদামে অ্যান্ড্রয়েড থাকলেও নেক্সাস ৪-কে ধরা হতো কমদামের মধ্যে সেরা অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস। কিন্তু সম্প্রতি মটোরোলা তাদের মটো জি ফোনের উদ্বোধন করে এই টাইটেল ছিনিয়ে নিয়েছে। যদিও নেক্সাস ৪ এখন আর অফিসিয়ালি বিক্রি হচ্ছে না বা প্লে স্টোরে নেই,  তবুও কিছু কিছু অনলাইন স্টোর, মার্কেট কিংবা সেকেন্ড হ্যান্ড নেক্সাস ৪ এখনও সহজলভ্য হওয়ায় ক্রেতারা প্রায়ই “নেক্সাস ৪ বনাম মটো জি” নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। তাদের জন্যেই আজকের এই তুলনামূলক রিভিউ।

এছাড়াও যদি আপনার ইতোমধ্যেই নেক্সাস ৪ থাকে, তাহলে মটো জি নেয়া উচিৎ হবে কি না তা নিয়ে সাহায্যের জন্যও দেখে নিতে পারেন নিচের নেক্সাস ৪ বনাম মটো জি তুলনামূলক রিভিউ।

বিল্ড কোয়ালিটি

a1

এলজির তৈরি নেক্সাস ৪ আর মটোরোলার মটো জি-এর মধ্যে আউটলুকে খানিকটা মিল পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে দু’টি ডিভাইসের সামনের দিকের ডিজাইন। কিন্তু এই দুই ডিভাইসের মধ্যে সাদৃশ্য ওইটুকুই। মটো জি তৈরিতে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেশি; অন্যদিকে নেক্সাস ৪-এ রয়েছে গ্লাস ও রাবার। সাধারণ অর্থে এখানে নেক্সাস ৪-কেই জয়ী বললেও পছন্দটা আপনার হাতেই। যদি আপনার প্লাস্টিক বিল্ড কোয়ালিটির ডিভাইস পছন্দ হয়, তাহলে মটো জি আপনার জন্য পারফেক্ট ফোন। প্লাস্টিক বলে মটো জি-কে মোটেই নিম্নমানের বিল্ড কোয়ালিটির ফোন বলা যাবে না। এছাড়াও লুক অ্যান্ড ফিল-এ পরিবর্তন আনার জন্য এর ব্যাক কভার পরিবর্তনেরও অপশন রয়েছে।

অন্যদিকে গ্লাস ও রাবারের সংমিশ্রণে তৈরি নেক্সাস ৪ দেখতে মটো জি থেকে বেশি প্রিমিয়াম মনে হলেও এর পেছনের গ্লাস ব্যাক ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও সহজেই স্ক্র্যাচ পড়ারও সম্ভাবনা রয়েছে নেক্সাস ৪-এর ব্যাক সাইডে। মটো জি-র ব্যাক সাইডেও দাগ পড়ার সম্ভাবনা কম নয়, বিশেষ করে এর উজ্জ্বল রঙের কারণে। কিন্তু মটো জি-তে রয়েছে ব্যাক কভার বদলানোর সুবিধা, যা অনেকদিন পরও আপনার ফোনকে নতুনত্ব দিতে পারে।

কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় বিল্ড কোয়ারিটির দিক দিয়ে এই দুই ফোনের মধ্যে এগিয়ে রয়েছে নেক্সাস ৪।

হার্ডওয়্যার

নেক্সাস ৪-এ রয়েছে কোয়াড-কোর স্ন্যাপড্রাগন এ৪ প্রো চিপসেট যার সঙ্গে ২ গিগাবাইট র‌্যাম ও অ্যাড্রিনো ৩২০ জিপিইউ যা মিলে সর্বশেষ অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন ও গেমস চালানোর মতো যথেষ্ট ক্ষমতা যোগানোর সামর্থ্য রাখে। বেশি র‌্যাম থাকার কারণে নেক্সাস ৪-এর মাল্টিটাস্কিং সুবিধাও অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে যা যে কোনো ব্যবহারকারীরই বেশ কাজে আসবে। তবে মটো জি-এর প্রসেসর তৈরিই করা হয়েছে কম পাওয়ারে বেশি সময় চলার মতো করে (power efficient). কোয়াড-কোর স্ন্যাপড্রাগন ৪০০ চিপসেটের গতি ১.২ গিগাহার্জ ও আর্কিটেকচার করটেক্স এ৭; পাশাপাশি গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিটে ব্যবহৃত হচ্ছে অ্যাড্রিনো ৩০৫ জিপিইউ ও ১ গিগাবাইট র‌্যাম, যার দু’টিই নেক্সাস ৪ থেকে অনেক কম।

ইন্টারনাল স্টোরেজ নিয়ে দু’টোর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কেননা দু’টিই ৮ ও ১৬ গিগাবাইটে সহজলভ্য। তবে ইন্টারনেটের গতিতে এই দুই ফোনে কিছুটা তফাৎ রয়েছে যদিও তা বাংলাদেশে প্রযোজ্য নয়। নেক্সাস ৪ সাপোর্ট করে ৪২ এমবিপিএস ডিসি-এইচএসডিপিএ যার অর্থ এটি সারাবিশ্বে সবচেয়ে দ্রুতগতির ৩জি কভারেজ নিতে সক্ষম। কিন্তু মটো জি কেবল ৩জি-তে সর্বোচ্চ ২১ এমপিবিএস স্পিডে ডেটা আদান-প্রদান করতে সক্ষম।

হার্ডওয়্যারের দিক দিয়েও তুলনামূলক শক্তিশালী প্রসেসর, জিপিইউ ও র‌্যামের কারণে সহজেই এই দিক থেকেও মটো জি থেকে এগিয়ে আছে নেক্সাস ৪। পাশাপাশি ওয়্যারলেস চার্জিং-ও হতে পারে দারুণ একটি সুবিধা যা মটো জি তে অনেক ব্যবহারকারীই হয়তো মিস করবেন।

ডিসপ্লে

মটো জি এর অন্যতম প্রশংসনীয় ফিচার হচ্ছে এর ডিসপ্লে। ৪.৫ ইঞ্চি ৭২০পি ডিসপ্লের কাছে সহজেই নেক্সাস ৪-এর ডিসপ্লে খানিকটা সাদাটে বা ওয়াশড-আউট মনে হবে। পিক্সেলের হিসেবে নেক্সাস ৪-এর ডিসপ্লে রেজুলেশন বেশি হলেও পিপিআই বেশি হওয়ার কারণে মটো জি এর ডিসপ্লেকে বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই নেক্সাস ৪-এর থেকে উন্নত বলে মন্তব্য করেছেন। প্রসঙ্গত, নেক্সাস ৪-এর ৪.৭-ইঞ্চি ডিসপ্লের পিপিআই ৩১৮; অন্যদিকে মটো জি-এর ৪.৫-ইঞ্চি ডিসপ্লের পিপিআই ৩২৬।

আর তাই ডিসপ্লের বিচারে পরে আসা মটো জি-ই স্থান করে নিয়েছে এই দু’য়ের মধ্যে প্রথম স্থান।

সফটওয়্যার

a2

আমরা সাধারণত অ্যান্ড্রয়েড ফোন নির্মাতারা অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের উপর নিজেদের তৈরি ইউজার ইন্টারফেস জুড়ে দেয়, ফলে একেক ডিভাইসের ইউআই একেকরকম হয়ে থাকে। স্যামসাং-এর টাচউইজ, এইচটিসির সেন্স তেমনই কিছু ইউজার ইন্টারফেসের নাম। কিন্তু মটোরোলা অ্যান্ড্রয়েড জগতে তাদের “পুনরায় যাত্রার” শুরু থেকেই স্টক অ্যান্ড্রয়েডের উপরই নিজেদের কিছু মডিফিকেশন ও অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে আসছে। শুরুটা মটো এক্স দিয়ে। অ্যাকটিভ নোটিফিকেশন, ওকে গুগল নাও, কুইক লঞ্চ ক্যামেরা জেসচার ইত্যাদি প্রশংসিত ফিচারগুলোর প্রায় সবগুলোই মটো জি-তে অনুপস্থিত। অর্থাৎ, মটো জি-তে আপনি পাচ্ছেন স্টক অ্যান্ড্রয়েড ৪.৩ এবং মটোরোলা অ্যাসিস্ট ও ট্রাস্টেড ব্লুটুথ-এর মতো অল্প কিছু মটোরোলা অ্যাপ্লিকেশন। অবশ্য অ্যান্ড্রয়েড ৪.৪ কিটক্যাট জানুয়ারির মধ্যেই মটো জি-তে আসবে বলে জানা গেছে।

কিন্তু নেক্সাস ৪ ইতোমধ্যেই অ্যান্ড্রয়েডের সর্বশেষ সংস্করণ আপডেট পেয়েছে এবং ভবিষ্যতেও অনেকদিনের জন্য আপডেট পেতে থাকবে। এছাড়াও ডেভেলপারদের মধ্যে জনপ্রিয় ডিভাইস হওয়ায় অফিসিয়ালি না হলেও আনঅফিসিয়ালি নেক্সাস ৪ আরও বহুদিন আপডেট পেতে থাকবে। এর একটি দারুণ উদাহরণ হতে পারে প্রথম নেক্সাস ডিভাইস নেক্সাস ওয়ানের কিটক্যাট আপডেট পাওয়া যেটি অ্যান্ড্রয়েড ৪.০ আইসক্রিম আপডেট থেকেই বঞ্চিত হয়েছিল।

সবমিলিয়ে কেবল নেক্সাস প্রোগ্রামের জন্যই নেক্সাস ৪-কে সফটওয়্যারের দিক দিয়ে এগিয়ে রাখা যায়। যেহেতু মটো জি-তে আলাদা কোনো ইউজার ইন্টারফেস নেই, সেহেতু পিউর অ্যান্ড্রয়েড এক্সপেরিয়েন্সের জন্য নেক্সাস ৪-ই এগিয়ে থাকবে।

ক্যামেরা

ফটোগ্রাফির জন্য অ্যান্ড্রয়েড ফোন কেনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ফটোগ্রাফির জন্য এই দুই ফোনের কোনোটিই খুব একটা সুবিধার নয়। তবুও ক্যামেরা যেহেতু আছে, তুলনা করতেই হয়। নেক্সাস ৪-এ রয়েছে ৮ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা যেটি মটো জি-এর ৫ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার চেয়ে দ্রুত ছবি তুলতে পারে, দিনে ভালোমানের ছবি আসে এবং ১০৮০পি ভিডিও শুট করা সম্ভব। লো-লাইট কন্ডিশনে এই দু’টি ডিভাইসের কোনোটিই খুব একটা ভালো ছবি তুলতে পারে না।

মটো জি-তে কেবল লো মেগাপিক্সেলই নয়, ছবিও স্বভাবতঃই নেক্সাস ৪ থেকে কিছুটা কম মানের আসে। তবে মটো জি’র ক্যামেরা অ্যাপ্লিকেশনটি স্টক অ্যান্ড্রয়েডের ক্যামেরা অ্যাপ্লিকেশনের চেয়ে ভালো ফোকাস ও এক্সপোজার কন্ট্রোল করতে পারে। অবশ্য গুগল জানিয়েছে শিগগিরই অ্যান্ড্রয়েডের স্টক ক্যামেরা অ্যাপ্লিকেশনে RAW ফাইল ফরম্যাট সাপোর্ট করবে যা সত্যিই বড় ব্যাপার। তবুও সার্বিক বিবেচনায় ক্যামেরার দিক দিয়ে মটো জি-এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেক্সাস ৪-ই জয়ী হবে।

ব্যাটারি লাইফ

মটো জি-এর ব্যাটারি ক্যাপাসিটি ২০৭০ এমএএইচ এবং নেক্সাস ৪-এর ব্যাটারি ক্যাপাসিটি ২১০০ এমএএইচ। মাত্র ৩০ এমএএইচ-এর পার্থক্য হলেও রিয়েল লাইফ ইউসেজে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে নেক্সাস ৪ ও মটো জি-তে। নেক্সাস ৪-এ ব্যবহৃত হয়েছে শক্তিশালী প্রসেসর। একই সঙ্গে এটি বেশ পাওয়ার-হাঙরিও বটে। তাই খুব দ্রুত ব্যাটারি শেষ হয়ে যায় নেক্সাস ৪-এ। অন্যদিকে মটো জি-এর power-saving প্রসেসরের সুবাদে এটি একদিনেরও বেশি ব্যাকআপ দিতে সক্ষম।

যেহেতু পাওয়ার ও পাওয়ার-সেভিং একসঙ্গে আসে না, সেহেতু আপনাকে বেছে নিতে হবে আপনি নেক্সাস ৪-এর শক্তিশালী প্রসেসর ও কম ব্যাটারি ব্যাকআপ নেবেন নাকি মটো জি-এর কম ক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর অথচ বেশিক্ষণ স্থায়ী ব্যাটারি ব্যাকআপ-এর সুবিধাকে প্রাধান্য দেবেন। তবে যেহেতু ব্যাটারি ব্যাকআপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়, সেহেতু এই বিবেচনায় এগিয়ে থাকবে মটোরোলার মটো জি।

সিদ্ধান্ত

a3

ওয়্যারলেস চার্জিং-এর মতো সুবিধাগুলো মিস করতে পারেন মটো জি-তে।

বাজারে আসার পর থেকে এক বছর পর্যন্ত নেক্সাস ৪ ছিল এই দামের সবচেয়ে ভালো ফোন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে এবার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঢুকিয়েছে মটো জি। তবে মটো জি ও নেক্সাস ৪ আগামী বছরগুলোতে বেশ ভালোই ডেভেলপার সাপোর্ট পাবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বিশেষ করে নেক্সাস প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে গুগলই হয়তো আরও ১২ মাস নেক্সাস ৪-এর আপডেট সরবরাহ করবে। তবে তাই বলে মটো জি যে থেমে থাকবে তাও নয়। মটো এক্স ও মটো জি নিয়ে মটোরোলা নিয়মিত আপডেট দেবে বলে জানিয়েছে যার অংশ হিসেবে জানুয়ারি নাগাদই মটো জি-তে অ্যান্ড্রয়েড ৪.৪ কিটক্যাট আপডেট দেয়া হবে।

মটো জি বনাম নেক্সাস ৪-এ কনফিউশনের সৃষ্টি হলেও নেক্সাস ৪ ব্যবহারকারীদের মটো জি-র দিকে হাত বাড়ানোর কোনো কারণ নেই। কেননা, সার্বিক বিবেচনায় নেক্সাস ৪ মটো জি থেকে বেশ শক্তিশালী ও ভালো বিল্ড-কোয়ালিটির একটি ডিভাইস। দ্বিধার সৃষ্টি হবে যদি মটো জি ও নেক্সাস ৪ থেকে বেছে নিতে হয়। যদিও নেক্সাস ৪ এখনও অফিসিয়ালি গুগল প্লে স্টোরে নেই, তবুও অনেক দোকানে কিংবা সেকেন্ড হ্যান্ড হিসেবে অনলাইন স্টোর থেকে নেক্সাস ৪ পাওয়া যেতে পারে।

কত দামে নেক্সাস ৪ হাতে পাচ্ছেন তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। কেননা, নেক্সাস ৪-এর দাম মটো জি থেকে বেশি ছিল। যদি মটো জি এর কাছাকাছি দামে নেক্সাস ৪ পেয়ে যান, তাহলে নিঃসন্দেহে নেক্সাস ৪ একটি ভালো চয়েস হবে। তবে আপনি যদি গেমিং, অ্যাপস এগুলোর প্রতি খুব একটা ক্রেজ না থাকে, যদি ব্যাটারি ব্যাকআপ আপনার কাছে মূখ্য হয়, তাহলে মটো জি আপনার জন্য পারফেক্ট।

সবমিলিয়ে পারফরম্যান্স বনাম ব্যাটারি ব্যাকআপ এবং দামের ভিত্তিতেই আপনি বেছে নিতে পারেন মটো জি বনাম নেক্সাস ৪ থেকে আপনার জন্য উপযুক্ত ফোনটি।

মটো জি বনাম নেক্সাস ৪-এ আপনার পছন্দ কোনটি এবং কেন? পারফরম্যান্স নাকি ব্যাটারি ব্যাকআপ, কোনটি আপনার কাছে মূখ্য?

Author: drmasud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *