ফ্রিলান্সিং মাষ্টার :: প্র্যাকটিকাল ফ্রিলান্সিং ক্যারিয়ার (পর্ব – ২২)

আস্‌সালামুআলাইকুম, আপা এবং ভাইয়ারা সবাই কেমন আছেন? আপনাদের ফ্রিল্যান্সিংয়ের খবর কি? কাজ কি একটা-দুইটা পেয়েছেন? আমার লেখাগুলো কি আপনাদের কাজ পেতে কিছু সহায়তা করে?

সহায়তা করলেই আমার স্বার্থকতা। আজ আমার একটা ডায়লগ নিয়ে কিছু সময় আলোচনা করব। আপনাদের জন্য সিরিজ লিখতে বসে কিছু মাথায় আসছিল না, তাই যা মাথায় আসলো তা নিয়েই লিখতে বসে পড়লাম। আসলে আপনারা তো প্রশ্ন খুব কম করেন, তাই আমি কি লিখবো খুজে পাই না। তবে না লিখলেও ভাল লাগে না। যাহোক, আসি কাজের কথায়।

আমি মাঝে মাঝে একটা ডায়লগ মারি, “ভাল কাজ জানলে, আপনি কাজের পিছনে দৌড়াতে হবে না, কাজই আপনার পিছনে দৌড়াবে।” আসলে অনেকেই মনে করেন যে “এই ডায়লগটা আমি শুধু শুধু বলি, এর সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই। আরে ভাইজান একটা জবে শত শত ফ্রিল্যান্সার বিড করে, আর আপনি বলেন কাজ পিছনে পিছনে ঘুরে। কিসব আজে-বাজে কথা, মাঝে মাঝে বলেন ভাই কোন হদিস পাই না।” ঐসব ভাইদের বলি, “ভাইয়া, আমি সত্যিই বলছি। কাজ জানা থাকলে কাজ পিছনে পিছনে ঘুরে। আপনার রেট কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলেও কাজ আপনার পিছু ছাড়বে না। বায়ারের সাথে বিভিন্ন ফুটানি করলেও বায়ার আপনাকে ছাড়তে চাইবে না। যেমন: বায়ারকে বললেন, আমি এখন ব্যস্ত আছি, আপনার কাজ এখন করতে পাড়ব না, দুই-তিন পরে সময় পাব। তখন দেখা যায় বায়ার বলে কোন সমস্যা নাই তুমি চাইলে আমার কাছ থেকে কয়েকদিন সময় নিতে পারো।”

কি, এই কথাগুলো বিশ্বাস হচ্ছে না? আসুন কয়েকটা বাস্তব উদাহরণ দেই।

দুই-তিন মাসে আগে, আমি একটা কাজে হায়ার হলাম। কাজটা ভালভাবে সম্পন্ন করে বায়ারকে দিলাম। কাজটা ফিক্সড প্রাইসের ছিল। আপফ্রন্ট কত নিয়েছিলাম ঠিক মনে পড়ছে না। এখন কাজতো দিয়ে দিলাম বায়ারের কোন খবর নাই। ভাবলাম, এই বুঝি টাকাগুলো ডুবে গেল। প্রায় মাসখানেক পরে দেখি বায়ার কাজটা ইন্ড করে আমাকে সব পেমেন্ট দিয়ে দিছে। ভাবলাম “বায়ারটাতো মানুষ হিসেবে খারাপ না, এত দিন পরেও আমার টাকা দিয়ে দিল।” এরপর দেখি বায়ার আমাকে আরেকটা কাজের কথা বলল। আমি বললাম, বিস্তারিত লিখে জানান। তিনি খুব সুন্দর করে বিস্তারিত দিলেন। কাজটা পড়ে মনে হল, মুল কাজটা করতে ২ থেকে ৩ মিনিট সময় লাগবে। বায়ারকে বললাম, এই মূহুর্তে আমি আরো কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। আপনার কাজ করতে হলে আমার রেট বেশী দিতে হবে (তখন অবশ্য আমি সত্যিই আরেকটা কাজে ব্যস্ত ছিলাম)। বায়ার ৫ ডলার দিতে রাজী হল। মনে মনে ভাবলাম দুই মিনিটে পাঁচ ডলার, খারাপ কিসের? সুপারম্যানের মত খুব দ্রুত কাজটা শেষ করে দিলাম। আর বললাম, এইবার আমার ট্যাকাগুলা দিয়ে দেন। ওমা, বায়ারের মন্তব্য পড়ে মনে হল- সে যেন খুশিতে নাচতে শুরু করেছে। যাইহোক, এইবারের কাজ শেষ করলাম। গত কয়েকদিন আগে দেখি ঐ একই বায়ার আবার আরেকটা পোষ্ট করেই, সরাসরি আমাকে ইন্টারভিউতে ডেকেছে।

ম্যাসেজটা ছিল এই রকম-

স্যার, আপনি এর আগেও আমার সাথে কাজ করেছিলেন। আপনার কাজগুলো আমার কাছে খুব ভাল লাগে। আমার কাছে এই মূহুর্তে একটা কাজ আছে। দয়া করে আপনি কি এটা করে দিতে পাড়বেন?

আরে আরে, বায়ারও দেখি আমাকে স্যার বলে! 😯

আমি উত্তরে লিখে দিলাম, এই মূহুর্তেতো আরো কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। আমি আপনার কাজটা করে দিতে পাড়বো, কিন্তু এখন করতে পাড়বো না। কিছু দিন পরে করে দিতে হবে। এই বলে, বায়ার আমাকে যে বাজেটে অফার জানিয়েছিল, তার দ্বিগুণ বাজেটে আমি রিপ্লাই দিলাম। সাথে সাথেই দেখি বায়ার আমাকে হায়ার করে ফেলেছে এবং কিছু আপফ্রন্টও দিয়ে দিল। আর বলল তার কাজটা খুব তাড়াতাড়িই প্রয়োজন, আমি যত আগে পারি তত ভাল হবে। তারপর আমি অন্য কাজগুলো ফেলে রেখে ঐ দিনই কাজটা শেষ করে দেই।

এখন আসেন আরেকটা কাজের দিকে- প্রায় পনের দিন আগে, একটা জব দেখলাম। জবটা ওপেন করলাম। আরে আরে… এ কি অবস্থা! জব ডিটেইলসে বায়ার এক্কেবারে ইতিহাস লিখে দিছে। চিন্তা করলাম, এত কষ্ট করে জবটা ওপেন করলাম, বিড না করে ছাড়ি কিভাবে? করলাম বিড, কভার লেটারে লিখলাম, “আপনার জব ডিটেইল্স পড়ার মত সময় আমার নাই। আপনি যদি ভাল সার্ভিস চান তাহলে আমাকে হায়ার করতে পাড়েন।” এই বলে জবটাতে এপ্লাই করলাম। প্রায় ২ মিনিট পরে দেখি বায়ার আমাকে skype এ কথা বলার জন্য আমন্ত্রন জানাচ্ছে। ওর সাথে কথা বলতে গেলাম। সে আমাকে প্রথমেই বলল, তার কয়েকটা ছোট প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় কি আমার আছে? আমি বললাম তোমার প্রশ্ন কর। তারপর সে তার প্রশ্নগুলো করল। আমি উত্তর দিলাম এবং তার সাথে কাজ করলাম। দেখলেনতো, কিভাবে কভার লেটার লিখেও কাজ পেয়ে গেলাম।

আরো কয়েকদিন পরে আরেক বায়ারকে পেলাম। সে বলল, দশ ডলার প্রতি ব্যানারে তাকে দশটা ব্যানার করে দিতে হবে। আমি বললাম, এত কম রেটে আমি কাজ করি না। তোমার বাজেট খুবই লো। এই বাজেটে তুমি আমার মত কন্ট্রাক্টারকে হায়ার করতে পাড়েবে না। সে বলল, আমি যে বাজেট বলছি এই বাজেটে সে কয়েকটা প্রিমিয়াম ডিজাইন কিনে নিতে পাড়বে। আমি উত্তর দিলাম, তোমার প্রিমিয়াম ডিজাইন থেকে আরো উন্নত ডিজাইন আমি দিব। (ব্যাটা, কাকে এসে প্রিমিয়াম দেখায়? আমি কি জ্বলে ভেসে আসা ডিজাইনার নাকী?) অবশেষে বায়ার আমার কথায় রাজী হল। আমি তাকে দুইটা ডিজাইন করে দেখালাম। ঐদুইটা দেখে সে বলে তার জন্য আর দশটা লাগবে না। সে ঐ দুইটাকেই তার দশটা সাইটে ব্যবহার করে নিবে। আমি বললাম, দশটার কথা বলে এখন দুইটা করাইয়া দৌড় দিবা, ঢং পাইলা নাকী? বাকীগুলো করে নিয়ে যাও। সে বলল, তার বাকীগুলো লাগেবে না। আমার করা দ্বিতীয় ডিজাইনটা সে তার নয়টা সাইটেই ব্যবহার করবে। ঐগুলোকে একটু এডিট করে দিতে। আর সে আমাকে দুইটা ব্যানারে পাচটা ব্যানারেরই দাম দিবে। তারপর আমি রাজী হই।

গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া আরেকটা ঘটনা। গত, দুই সপ্তাহ ধরে আমাদের এখানে কারেন্টের খুব যন্ত্রনা হচ্ছে। দশ দিনে দশ ঘন্টার মতও কারেন্ট পাই নি। প্রায় দশ দিন পর কারেন্ট পেলাম। আল-হেরার অনেক কাজ পরে আছে। ঐগুলো করতে শুরু করেছি। এই মূহুর্তে দেখি ওডেস্ক থেকে একটা ইনভাইটেশন আসছে। আমি মনে মনে ভাবলাম গত দশ দিনের মধ্যে একবারও ওডেস্কে গেলাম না, আর এ দিকে কাজ এসে আমার দরজায় নক করছে, ঘটনা কি? গিয়ে দেখি একজন বায়ার ওডেস্কে গ্রাফিক্স ডিজাইনার লিখে সার্চ দিয়ে আমার প্রোফাইল খুজে পেয়েছেন, এবং আমাকে তার কাজের জন্য অফার জানিয়েছেন। তখন আমর আওয়ারলি রেট ৭ ডলার। আমি বায়াকে ১১ ডলার আওয়ারলি রেটে অফার জানালাম। আসলে কাজটা করার কোন ইচ্ছাই ছিল না। কারণ, ফরিদ ভাইয়ের অনেক কাজ জমে আছে, ঐকাজগুলো ফেলে যদি আমি ওডেস্কে কাজ করতে যাই তাহলে উনি হয়তো রাগ করতে পাড়েন। এর জন্য একটু বেশী রেটেই বিড করলাম। তবু দেখি বায়ার ইন্টারভিউতে ডাকে। ফরিদ ভাইয়ের সাথে কথা বললাম, “আপনার কাজ করতেছি, এমন সময় ওডেস্কে থেকে বিড ছাড়াই ১১ ডলার আওয়ারলি রেটে কাজ করার আমন্ত্রন পেলাম। কাজটা করব নাকী?” ফরিদ ভাই কাজ করার জন্য সম্মতি দিলেন। আমি কাজের জন্য ইন্টারভিউতে গেলাম। মাত্র কয়েক মিনিট বায়ারের সাথে কথা বলার পর বায়ার আমাকে হায়ার করে নিল। তারপর প্রায় চার ঘন্টায় বায়ারের কাজটা শেষ করে ফেলি। বায়ার আমার কাজে খুশি হয় এবং সে তার কোম্পানীর জন্য আমাকে অনগয়িং কন্ট্রাক্টার হিসেবে হায়ার করে নেয়।

উপরের লেখাগুলোতো পড়লেন। এইবার বলেনতো, কাজ জানা থাকলে কি কাজের পিছনে ছুটতে হয়? কাজই এসে আপনাকে খুজে নিবে। আসলে বায়াররা চায় তাদের কাজটা খুব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হোক। টাকা তাদের কাছে বড় কোন ফ্যাক্টর নয়। অনেক আছে, পনের ডলার আওয়ারলি রেট দেখেও তাদের বন্ধু-বান্ধবের সাথে গল্প করে যে তারা খুব কম রেটে অনলাইনে কাজের লোক পেয়েছে। এইবার ভাবুন, যেখানে আমাদের দেশের অনেক চাকরিজীবির মাসিক আয় ১০০ ডলার হয়ে থেকে, সেখানে ১৫ ডলার আওয়ারলি রেট হলেও তাদের কাছে এটা কম। তাই আগে কাজ শিখুন, পরে দেখবেন কাজ এবং টাকা দুটাই আপনাকে খুঁজে বের করে নিচ্ছে।

আর্টিকেলটা ভাল লাগলে মন্তব্যের মাধ্যেমে উৎসাহ দিবেন। আর আপনাদের কারো কোন প্রশ্ন থাকলে আমাকে করবেন। হোক সেটা বড় বা ছোট। আপনাদের কোন বিষয়ে যদি বিশদ কোন ধারণার প্রয়োজন পড়লে আমাকে জানাবেন। আমি প্রয়োজন হলে উত্তর হিসেবে পুরো একটা পোষ্টই লিখে দিব। তাই প্রশ্ন করতে কোন ধরণের দিধা বোধ করবেন না।

সবাই ভাল থাকবেন। আল্লাহ্‌ হাফেজ।

Author: softwear man

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *