শবে-বরাত কি ? গুরুত্ব,ফজিলত ও তাৎপর্য | কুরআন - হাদিসের আলোকে

শবে বরাত কি ? গুরুত্ব ,ফজিলত ও তাৎপর্য কুরআন- হাদিসের আলোকে

লেখক : | ০ টি কমেন্ট | 23 বার দেখা হয়েছে দেখা হয়েছে । শেয়ার করে আপনবর বন্ধুদের জানিয়ে দিন ।

শবে বরাত

শবে বরাত শব্দ দু’টি ফারসি। শব অর্থ রাত বা রজনী, বরাত অর্থ ভাগ্য। একসাথে এর অর্থ “ভাগ্য-রজনী”। বারাআত বললে অর্থ হবে সম্পর্কচ্ছেদ। আরবিতে এ রাতকে বলা হয় “লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (শাবান মাসের মধ্যরজনী)”।

মুসলিম সমাজে ছয়টি রাতকে সীমাহীন গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। রাতগুলো হলো, জুমার রাত,  রজব মাসের প্রথম রাত,  শবে বরাতের রাত,  দুই ঈদের রাত ও কদরের রাত। শবে কদর সম্মন্ধে পবিত্র কোরআনে পূর্ণাঙ্গ একটি সুরা রয়েছে। অবশিষ্ট রাতগুলো সম্পর্কে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) এক হাদিসে স্পষ্ট বিবরণ দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, পাঁচটি রাত এমন আছে যাতে কোনো দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না। সে রাতগুলো হলো, জুমার রাত,  রজব মাসের প্রথম রাত,  শবে বরাতের রাত,  দুই ঈদের রাত ও শাবান মাসের মধ্যরাত (শবে বরাত)।(মুসান্নেফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ৭৯২৭, শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৩৪৪০, ফাজাইলুল আওকাত, হাদিস : ১৪৯,তারতিবুল আমালি, হাদিস : ১৮৩৮) ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ রাতের মধ্যে শবে বরাত অন্যতম।

 

শবে বরাতের রাতটি মুসলিম সমাজে গুরুত্বের সাথে পালিত হয়ে আসছে । শবে বরাতের রাতটির সীমাহীন গুরুত্ব ও ফজিলতের কারণেই মুসলিম সমাজ ইবাদত-বন্দেগি করে উদযাপন করে থাকে। এ রাতের ইবাদত-বন্দেগি মহান আল্লাহ খুবই পছন্দ করেন। শবে বরাতের রাতের ফজিলতও অনেক বেশি।

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এক রাতে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বিছানায় না পেয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। জান্নাতুল বাকিতে (মদিনার সর্ববৃহৎ কবরস্থান) গিয়ে তাঁকে পেলাম। তিনি আকাশ পানে মাথা উঁচু করে ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি ভেবেছ, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.) তোমার ওপর জুলুম করবেন? হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম তেমন কিছু নয়। আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোনো স্ত্রীর নিকট গমন করেছেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা নিসফে শাবানের রাতে (শবে বরাতে) সৃষ্টির প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন এবং কালব গোত্রের বকরির পশমের চেয়েও অধিক মানুষকে ক্ষমা করে দেন।(সুনানে ইবনে মাযা, হাদিস :১৩৮৯, মুসনাদে ইসহাক, হাদিস : ৮৫০, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৬০১৭)

 

হাদিসের আলোকে অনেক হাদিসবিদ শাবানের মধ্যরাতের ফজিলত আছে বলে মনে করেন। তাদের মধ্যে আছেন ইমাম আহমাদ, ইমাম আওযায়ি, ইমাম ইবন তাইমিয়া, ইমাম ইবনে রজব ও আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানি (র:)।

শাবানের মধ্যরাত কি সত্যি ভাগ্যরজনী? উত্তর না, এ রাত ভাগ্যরজনী নয়। মূলত এ রাতকে ভাগ্যরজনী বলার পেছনে কাজ করেছে আল কুরআনের সূরা আদ দুখানের ৩ ও ৪ নং আয়াত দু’টির ভুল ব্যাখ্যা। এ আয়াতদ্বয়ের তাফসিরে বেশির ভাগ মুফাসসির রমজানের শবে কদরকে বুঝিয়েছেন। ইবনে কাসির ও আল্লামা শাওকানি (র:) ও এ মত প্রকাশ করেছেন। দলিল সূরা আলকদর, আয়াত ০১, সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৫। তাই ভাগ্যরজনী হচ্ছে শবে কদর যা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলো।

 

শবে বরাতের গুরুত্ব

মুমিন-মুসলমানের জীবনে শবে বরাতের গুরুত্ব সীমাহীন। কারণ এ রাতের ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একান্ত সান্নিধ্য লাভ করতে পারে এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে।

হজরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যখন মধ্য শাবানের রাতটি (শবে বরাত) আসে,  তোমরা রাত জেগে নামাজ (নফল) আদায় করো এবং দিনে রোজা রাখো। কেননা এ রাতে সূর্য ডোবার সাথে সাথে মহান আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে আসেন। আর আহ্বান করতে থাকেন, আছ কি কেউ ক্ষমা প্রার্থণাকারী?  আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। আছ কি কেউ রিজিক প্রার্থনাকারী?  আমি তাকে রিজিক দান করব। আছ কি কেউ আরোগ্য কামনাকারী?  আমি তাকে রোগ থেকে আরোগ্য দান করব। এভাবে মহান আল্লাহ সূর্যোদয় পর্যন্ত আহ্বান করতে থাকেন।(সনানে ইবনে মাযা, হাদিস : ১৩৮৮)”

সুতরাং যে রাতে মহান আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করার জন্য আহ্বান করতে থাকেন এবং অপেক্ষা করতে থাকেন, সে রাতটি যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

শবে বরাতের তাৎপর্য :

শবে বরাতের রাতটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ফজিলতপূর্ণ এ রাতে মহান আল্লাহ বান্দার গুনাহ ক্ষমা করেন ঠিকই কিন্তু নিঃশর্ত ভাবে নয়। মহান আল্লাহর ক্ষমা পেতে তাকে পাশবিক গুণ বর্জন ও ঈমানের দাবি পূরণ করতে হবে।

হজরত কাসির ইবনে র্মুরাহ আল-হাজরামি মাকহুল থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,

রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শাবান মাসের মধ্য রজনীতে (শবে বরাতে) প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং মুশরিক আর হিংসুক ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন।”(সুনানে ইবনে মাযা, হাদিস : ১৩৯০, মুসান্নেফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ৭৯২৩,মুসান্নেফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস : ২৯৮৫৯ )

হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) নবী করিম (সা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, “নিসফে শাবানের রাতে (শবে বরাতে) আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টির প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক আর হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। “(সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৫৬৬৫, মুসনাদে শামিয়্যিন, হাদিস : ২০৫)

সুতরাং শবে বরাতের মহৎ রজনীতে সব মুমিন মুসলমানকে নিজ আত্মার সমস্ত খেদ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে একনিষ্ঠ ভাবে মহান আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। তাহলেই কেবল মহান আল্লাহর ক্ষমা লাভ করা যাবে।

লেখাটি আপনাদের ভাল লেগেছে?
FavoriteLoadingপ্রিয় পোষ্ট যুক্ত করুন

১টি কমেন্ট করুন

*